গোদাগাড়ীর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ‘চিট রাসেল’ যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হয়েও প্রকাশ্যে
বিশেষ প্রতিনিধিঃ
শুনতে আশ্চর্য জনক মনে হলেও সত্য উঠে এসেছে রাজশাহী ও উত্তরাঞ্চলের আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী মনোয়ারুল হাসান রাসেল, যিনি ‘চিট রাসেল’ নামে পরিচিত, তার বিরুদ্ধে আদালতের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ঘোষণার পরও দীর্ঘ সময় ধরে গ্রেপ্তার না হওয়া এবং তার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে মামলা না হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে দেশ জুড়ে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, দায়রা মামলা নং-৩০৯৫/২০২১ (সূত্র: কোতোয়ালী থানার মামলা নং-০৮ (০৯)১৯)-এ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(১) এর টেবিল ১০(গ), ৩৮ ও ৪১ ধারায় দায়ের করা মামলায় পলাতক আসামি মনোয়ারুল হাসান রাসেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-৪, চট্টগ্রাম তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। একই সঙ্গে আদালত তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন।
তবে অভিযোগ রয়েছে, আদালতের রায় ও পরোয়ানা জারি হওয়ার পরও তিনি এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হননি। পাশাপাশি, দীর্ঘদিনের মাদক ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ থাকলেও তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে কোনো মামলা হয়নি, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। উলটো সে প্রকাশ্যে মানুষকে হুমকি ধামকি দিয়েছেন এমন অভিযোগে কিছুদিন আগেওবতার নামে রাজশাহীর চন্দ্রিমা থানার জিডি পর্যন্ত হয়েছে।
কে এই ‘চিট রাসেল’?
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার আঁচুয়া তালতলা গ্রামের বাসিন্দা মনোয়ারুল হাসান রাসেল, স্থানীয়ভাবে ‘চিট রাসেল’ নামে পরিচিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রে তিনি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিতি পান।২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবর গভীর রাতে রাজশাহী মহানগরীর উপশহর এলাকায় মহানগর পুলিশ (আরএমপি) ও গোয়েন্দা পুলিশের যৌথ অভিযানে রাসেল ও তার স্ত্রী মরিয়মকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে তাদের ভাড়া বাসা থেকে ৮৮০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
সেসময় পুলিশ জানায়, রাসেল দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হন।এরও আগে, ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট টাঙ্গাইলের বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব থানা এলাকায় র্যাব-১২ প্রায় ৬০ হাজার পিস ইয়াবা ও একটি ট্রাকসহ রাসেলকে আটক করে। তখন জব্দকৃত ইয়াবার বাজারমূল্য ছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা।
র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, রাসেল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বড় ইয়াবা সরবরাহকারী ছিলেন। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোরসহ বিভিন্ন জেলায় তার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ছিল।স্থানীয়দের দাবি, একসময় বাসের হেলপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা রাসেল পরে মাদক সিন্ডিকেটে যুক্ত হন। প্রথমে হেরোইন বহনের কাজ করলেও পরবর্তীতে নিজস্ব নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে ইয়াবা ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তার করেন।
অভিযোগ রয়েছে, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে তিনি অল্প কয়েক বছরের মধ্যে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হন। রাজশাহী শহরে বহুতল ভবন নির্মাণ, দামি ফ্ল্যাট, জমি ও অন্যান্য স্থাবর সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।মানি লন্ডারিং তদন্তের দাবিসংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পরও রাসেল কীভাবে এখনো গ্রেপ্তারের বাইরে রয়েছেন।
বিপুল সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী তদন্ত ও মামলা হওয়া উচিত ছিল। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকাশ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।স্থানীয়দের দাবি, আদালতের সাজা কার্যকর, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়ন এবং তার সম্পদের উৎস তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। এ ছাড়া এই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীকে কে সেল্টার দিচ্ছেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলেছেন সুশীল সমাজ।



